ইলেক্ট্রিসিটি ক্রাইসিসের সম্ভাব্য বিকল্প পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎঃ পর্ব ০১ এর পরবর্তী আলোচনা।
পুরো বিশ্ব ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব শক্তির দিকে ঝুকছে। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কথাটা ক্ষোভ থেকে বললাম। কারন উন্নত বিশ্ব পরিবেশ ও জলবায়ুর যথেচ্ছ ক্ষতি করার পর নিজেরা অর্থনৈতিকভাবে একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের জনগনের জীবনমানের উন্নয়ন করেছে।
তার মানে এই না, যে আমাদেরও পরিবেশের ক্ষতি করতেই হবে বাধ্যতামূলক ভাবে। এই দিক দিয়ে দেখলে আমাদের মতো দেশগুলোর অপেক্ষাকৃত অধিক পরিবেশ দূষনকারী প্রকল্পগুলো থেকে তাদের (উন্নত দেশগুলোর) সহযোগিতার আশ্বাস সরিয়ে নেয়া যৌক্তিক।
কিন্তু তাদের অসাধারণ অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকার পরও তারা যখন নিজেদের গাফিলতিতে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদন করে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরনে ব্যার্থ হয়ে কয়লার মতো পরিবেশ দূষনকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালুর সিদ্ধান্ত নেয়, তা প্রমাণ করে তারা শুধু অন্যের উপর ছড়ি ঘোরাতে পছন্দ করে। ডলারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমাদের একরকম হাতের মুঠোয় আমাদের মতো দেশগুলো। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বৈশ্বিক সমস্যা বৃদ্ধিতেও তারা দুবার ভাবে না।
আফসোস করে লাভ হলে হয়তো আফসোস করতে থাকতাম আরো। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে আমরা অনেক কিছুই করতে পারতাম, আমাদের নৈতিক স্খলন ও দূর্নীতির জন্য যেটা হয়ে উঠে না।
সাম্প্রতিক লোড শেডিং ইস্যুতে সরব সবাই। উৎপাদন ও শক্তি খাতের মূল চালিকাশক্তি বা কাঁচামাল হলো জ্বালানী। আমাদের জ্বালানী নীতি নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, আগুনে ঘি না ঢেলে অবস্থা থেকে কিভাবে উত্তরন করা যায় ও এমন অবস্থায় ভবিষ্যতে না পড়ার জন্য কিরকম ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে তুলে ধরবো অল্প অল্প করে।
সৌরবিদ্যুত নিয়ে ইতোমধ্যে একটা পরিচিতিমূলক আলোচনা করেছি। আজকের মূল প্রসঙ্গ প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রচলিত সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা।
ভারতে সোলার সিস্টেমের তিনটা ধরন দেখা যায়।
০১) অনগ্রিড
০২) অফগ্রিড
০৩) হাইব্রিড
এর মধ্যে, অনগ্রিড সিস্টেম সহজলভ্য, স্বল্পমূল্যের। অনগ্রিড সিস্টেমের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা শব্দ "নেট মিটারিং" মাথায় রাখবেন।
অনগ্রিড সিস্টেম হচ্ছে ন্যাশনাল গ্রিডের সাথে সংযুক্ত ব্যক্তিগত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় গ্রাহক তার নিজস্ব খরচে সোলার সিস্টেম স্থাপন করে। যাতে, তার বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত সোলার প্যানেল যে বিদ্যুৎ উতপন্ন করে সেটা তার ইনভার্টার হয়ে AC তে রুপান্তরিত হয়ে মডিফাইড মিটার দিয়ে গ্রিডে যুক্ত হয়।
এক্ষেত্রে, বলে রাখি আমাদের সাধারণ যে মিটারগুলো আছে সেগুলো শুধু আমাদের বিদ্যুৎ খরচ (কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে সেটা দেখায়)। কারণ আমরা শুধু বিদ্যুৎ নিই।
কিন্তু অনগ্রিড সিস্টেমে গ্রাহকরা যেমন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেন তেমনি সোলারে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করেন। এক্ষেত্রে একটা উভমুখী মিটারের প্রয়োজন হয় (ক্ষেত্রবিশেষে দুইটা মিটারও হতে পারে। একটা খরচের হিসাব করবে অন্যটা সোলার থেকে গ্রিডে যাওয়া বিদ্যুতের হিসাব রাখবে)।
এখন প্রশ্ন হলো একজন গ্রাহক কেন ন্যাশনাল গ্রিডে নিজের টাকায় উতপন্ন বিদ্যুৎ দিবে?
এখানেই আসে নেট মিটারিং এর ব্যাপার। সাধারণত অনগ্রিড সিস্টেম স্থাপনের আগে কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়। বিশেষ করে একবছরের বিদ্যুৎ বিলের কাগজ। যেটা দিয়ে অনগ্রিড সিস্টেম স্থাপনের অনুমতি দেয়ার বিবেচনা করা হয়। সাধারণত গ্রাহকের খরচ করা বিদ্যুতের গড় হিসেব করা হয়। এবং গড় ইউনিটের ৭০% ক্ষমতা পর্যন্ত সোলার পাওয়ার স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয় অনগ্রিড সিস্টেমের ক্ষেত্রে।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে কেন ৭০% বা এটা বিবেচনায় আনার দরকারটাই বা কি?
এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিপনন কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির জটিলতা আছে। সেগুলোর বিদ্যুৎ পরিবহন করার একটা সীমা আছে। সেই সীমার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে গোলযোগ হয়ে বিকল (এমনকি আগুন ধরে যাওয়ার) হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
নেট মিটারিং সিস্টেম যেটা করে, গ্রাহকের চলতি মাসের বিদ্যুৎ খরচ (ইউনিট) থেকে সোলারে উৎপাদিত বিদ্যুৎ (ইউনিট) বিয়োগ করা হয়। সেটা অনুযায়ী ফাইনাল বিল করা হয়।
উদাহরণস্বরুপঃ
বিবাহিত মাসুদ সাহেবের পরিবারের জুলাই মাসের বিদ্যুৎ খরচ ১০০ ইউনিট (কিলোওয়াট/ঘন্টা)। অন্যদিকে তার স্থাপিত সোলার সিস্টেম থেকে গ্রিডে যুক্ত হওয়া বিদ্যুতের পরিমান ৮০ ইউনিট।
তাহলে তার সংশোধিত বিল হবে ১০০-৮০= ২০ ইউনিটের মূল্য। এক্ষেত্রে ১ ইউনিটের মূল্য ১০ টাকা হলে বিল আসবে ২০*১০=২০০ টাকা + অন্যান্য প্রযোজ্য চার্জ।
এখানেও প্রশ্ন আসতে পারে, যদি কোন মাসে খরচের চেয়ে বেশি উতপাদন হয়?
উদাহরণস্বরুপঃ
অবিবাহিত শাওনের পরিবারের সদস্যরা সবাই বাসায় থাকলে বিদ্যুৎ বেশি খরচ হয়৷ না থাকলে কম। এক্ষেত্রে জুলাই মাসে তার বিদ্যুৎ খরচ ৬০ ইউনিট ও তার সোলার থেকে গ্রিডে যুক্ত বিদ্যুৎ ৮০ ইউনিট হলে তার নেট বিল ওইমাসে ০। সাথে কেবল অন্যান্য চার্জ বাবদ খরচ দিতে হবে।
এখানে ৬০-৮০=-২০ অর্থাৎ যে ২০ ইউনিট অতিরিক্ত ছিল এটা পরের মাসের বিলে যেয়ে এডযাস্ট হবে। মানে পরের মাসেও গ্রিডে যদি ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ যোগ করে সোলার সিস্টেম সেটার সাথে অতিরিক্ত ২০ ইউনিট যুক্ত হবে।
অর্থনৈতিক বছর শেষে (জুন মাস শেষে) যদি এই অতিরিক্ত থেকে যায় সেটার একটা নামমাত্র মূল্য নির্ধারন করে পরিশোধ করা হয় (২ থেকে ৩ টাকা ইউনিট)। যেকারণে অতিরিক্ত ক্ষমতার সোলার প্যানেল স্থাপনে নিরুৎসাহিত করা হয় বলে জানা যায় (ইন্ডিয়ায়), কারন গ্রাহকের জন্য লাভজনক হয় না।
একটি হিসাবে দেখা যায়, সোলার সিস্টেম স্থাপনে যে খরচ হয় তা ৪ থেকে ৬ বছরে উঠে আসে নেট মিটারিং সিস্টেমে বিল এডযাস্ট করার মাধ্যমে। সোলার সিস্টেমের জীবনাকালের বাকি সময়টা মূলত গ্রাহকের লাভ হতে থাকে। গড়পড়তা ৩০ বছর প্যানেলের লাইফ সাইকেল হলে সেই লাভের পরিমাণ বিপুল হয়। মূল্যস্ফীতি হিসাবে নিলে আরো বেশি মুনাফা হয়।
এগুলোতো সব অনগ্রিড সিস্টেমের সুবিধা। অসুবিধা?
একটা অসুবিধা হচ্ছে লোডশেডিং এর সময় বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা। কারণ, গ্রিডে যুক্ত থাকায় যতক্ষন বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু থাকে ততক্ষণই বিদ্যুৎ থাকে সিস্টেমে।
এখানে আসে অফগ্রিড সিস্টেমের মাহাত্ম্য। অফগ্রিড সিস্টেমে গ্রাহকের সোলার সিস্টেম গ্রিডের সাথে যুক্ত থাকে না, যুক্ত থাকে গ্রাহকের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ লাইনের সাথে। সাধারণত অফগ্রিড সিস্টেমে ব্যাটারি ব্যাকাপ থাকে। যাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে তো বটেই, রাতেও যেনো সঞ্চিত বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করা যায়!
গ্রামীণ সোলার হোম সিস্টেমগুলো মূলত অফগ্রিড। বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চল, যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই।
অফগ্রিডের অসুবিধা নেই?
আছে৷ এতে ব্যাটারি লাগায় সিস্টেমের খরচ তূলনামূলক অত্যধিক। সেইসাথে রক্ষনাবেক্ষনও অধিক সময়সাপেক্ষ। আর নেট মিটারিং এর সুবিধা না পাওয়াও একটা অসুবিধা বটে।
লোডশেডিং এর সময় বিদ্যুৎ থাকবে আবার নেট মিটারিং সুবিধা আছে এমন সিস্টেম করা যায় না?
অবশ্যই যায়। যেটাকে হাইব্রিড সিস্টেম বলে। এই সিস্টেমটা পূর্বে আলোচিত দুইটা সিস্টেমের মিশেলে তৈরি। যেখানে ব্যাকাপ সিস্টেমও থাকে, থাকে নেট মিটারিং সিস্টেমের সংযুক্তিও। অসুবিধার যায়গায় এর প্রাথমিক স্থাপনার খরচ আর ঝক্কিঝামেলা।
এই ছিল ভারতের সৌরশক্তি ব্যবহারের একটা দিকের আলোচনা। সোলার প্ল্যান্টও স্থাপিত করতে পারছে তারা প্রচুর পরিমানে। কারণ তাদের যথেষ্ট জায়গা আছে, যেগুলো অব্যবহৃত ও পতিত।
আমার দেশ কি অমন ব্যবস্থায় ভালো করবে? সৌরবিদ্যুতের চ্যালেঞ্জ গুলো কি কি? আমাদের বর্তমান অবস্তা কি? ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কেমন হতে পারে? এগুলো নিয়ে ইনশাআল্লাহ আগামী পর্বে কথা বলবো।
(আজকের আলোচনার ক্রেডিট যাবে Labour Law Adviser নামের ইউটিউব চ্যানেলের কাছে। তাদের কন্টেন্ট থেকেই ভারতের সোলার সিস্টেম রিলেটেড খুটিনাটি তথ্যের মূল রসদের যোগান এসেছে। ছবি কৃতিত্ব ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ডটকম)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন