শনিবার, ২১ মে, ২০২২

রিয়েল লাইফ লটারি, প্রস্তুত ভাইরালিটি ও অপ্রস্তুত ভাইরালিটি

সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে ভাইরাল কথাটার সাথে আমরা পরিচিত। অল্প সময়ে কোন একটা তথ্য, লেখা, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি দিয়ে কারোর (বা কোন বিষয়, বস্তু) রাতারাতি পরিচিতি পাওয়াটাকেই ভাইরাল হওয়া বলা যায়।


লটারি অন্যদিকে একটা টোকেন যেটা খুবই অল্প দামের হলেও সাধারণত এর পুরস্কার অনেক মূল্যবান হয়। দেশের জনসাধারণের কাছে লটারি জিনিসটা খুবই পরিচিত। অনেকেই লটারি কিনে আশায় বসে থাকেন, যদি লাইগা যায়!


নাহ অপরাধবোধ জাগাইতে চাইতেছি না। আজকে বরঞ্চ কিছু মানুষের বাস্তব জীবনের লটারির মতো ঘটনা, সেগুলো জিতে তাদের কি প্রাপ্তি হয়েছে সেটা বলবো। আর লটারি জেতার সম্ভাবনা কিভাবে বাড়ানো যায় তা বলবো।


ঘটনা ০১ঃ

ভারতের জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো “কৌন বনেগা কারোরপাতি” বা কে হবে কোটিপতির ২০১১ সিজনে সুশিল কুমার নামের একজন সাধারণ লোক ৫ কোটি রুপি জিতে। সেই সময়ে তুমুল জনপ্রিয় ও আলোচিত হয়। মিডিয়া, সামাজিক অনুষ্ঠান (সোশ্যাল মিডিয়া তখনো সেভাবে এভেইলেবল ছিল না সবার কাছে) ও অন্যান্য শোতে ডাক পেতে থাকেন। যা থেকে ট্যাক্স ও আনুসাংগিকতা চুকিয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকার মতো হাতে পায়! কি ভাবছেন? লাইফ সেট?


হ্যাঁ, কোটি টাকা পেলে আর কি লাগে জীবনে। উড়িয়েও তো শেষ করা যাবে না। তাই আমরা অনেকেই যেমন করতাম, তিনিও করেছিলেন। টাকা লাগামহীনভাবে খরচ করতে থাকলেন। অবশ্য অনেক দানও করেছিলেন।


এদিকে তার পড়াশোনায়ও সময় দিতে পারছিলেন না বাইরের জীবনের জনপ্রিয়তায় সময় দিতে দিতে। “খ্যাতির বিড়ম্বনা” কবিতা যারা পরেছেন, তারা সহজেই যোগসূত্র করে ফেলতে পারবেন দুটো ঘটনা। একসময় খ্যাতি তার বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ালো। এদিকে আকাশসম মনে হওয়া কোটি টাকাও শেষ হয়ে আসতে থাকলো। অবশ্য তিনি ক্যাব ব্যাবসা, সিমেয়ও ইনভেস্ট করেছিলেন। কিন্তু সবই ফেল হয়। এমনকি শোনা যায় যে দানগুলো করেছিলেন সেগুলোও ভুল যায়গায় গিয়েছিল। মানে কিছু সুবিধাবাদীরা সেগুলো নিয়ে নিয়েছিল। অতঃপর তার সব টাকাই এক একে শেষ হয়ে যায়।


ঘটনা ০২ঃ

রানু মণ্ডলের নাম শোনেননি কেউ আছেন! সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া রানু মন্ডল রাতারাতি ভাইরাল হয়ে গিয়েছিলেন ২০১৯ সালে। স্টেশনে গাওয়া একটি গান সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে তারকা খ্যাতি পেয়ে যান। রিয়্যালিটি শোতে ডাক পান অতিথি হিসেবে, হিমেশ রেশমিয়ার সাথে ডুয়েট গান করেন। একদম জিরো থেকে হিরো যাকে বলে হয়ে যান।


কিন্তু তার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে ভক্তদের সাথে তার নাক সিটকানো আচরণের জন্য। যেই নেটজেনরা মাথায় তুলেছিল, তারাই ধীক্কার জানাতে থাকে। যেভাবে প্রশংসা করেছিল “ষ্টেশনে গান গেয়ে টাকা কামানো কারোর গলা এতো সুমধুর!” সেই নেটিজেনদেরই অনেকে একইভাবে ধিক্কার দিতে থাকেন “ষ্টেশনের ভিখারির কাছে এর চেয়ে বেশি কি আশা করা যায়! একটু জনপ্রিয়তা পেতেই অহংকার চেপেছে!”


ঘটনা ০৩ঃ

গত বছর শ্রীলঙ্কান ভাষার একটি গান তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। গানটির নাম ছিল “মানিকে মাগে হিতে।” প্রথমে টিকটকে ভাইরাল হলেও আস্তে আস্তে অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল জনপ্রিয়তা পায় গানটি ও গানটির গায়েন “ইয়োহানি দিলোকা ডি’সিলভা” ডাকনাম ইয়োহানি। স্বাভাবিকভাবেই দেশ বিদেশের বহু ইন্টার্ভিউ, শো তে ডাক পেতে থাকেন ইয়োহানি।


তারপর? তারপর আরকি। কদিন যেতেই ফিকে হয়ে যায় সব! এমন ভাবছিলেন? তা হয়নি। আদতে এখনো তার জনপ্রিয়তা বিদ্যমান। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ইয়োহানি ভারতে এসে কনসার্ট করে তার দেশের জন্য সহযোগিতা চেয়েছিল। শ্রীলঙ্কার অবস্থা ভাল না হলেও অনুমান করা যাচ্ছে তার জনপ্রিয়তা বিদ্যমান এখনো।


প্রথম ঘটনায় টাকা আর জনপ্রিয়তা একসাথে ধরা দিয়েছিল সুশিল কুমারের কাছে। মনে মনে হয়তো তিনিও ভেবেছেন কোটি টাকা জেতার কথা। কিন্তু অনুমান করা যায় এই জনপ্রিয়তা আর টাকা একসাথে সামলানোর মতো দক্ষতা, বা নতুন এই জনপ্রিয় অবস্থায় সামলিয়ে নেয়ার অবস্থায় তিনি ছিলেন না। যার কারণে সেগুলো তিনি ধরে রাখতে পারেননি। অবশ্য পরে তিনি পড়ালেখা চালিয়ে যান। খুব সম্ভবত তিনি এরপর আঠারো হাজার টাকা (রুপির) চাকরি শুরু করেন। সাধারণ জীবন যাপন করছেন।


দ্বিতীয় ঘটনায় রানু মণ্ডলের কাছে জনপ্রিয়তা ধরা দিয়েছিল ভাইরালিটির মাধ্যমে। এই সময়ে যেটাকে একরকম টাকাই বলা যায়। যে যত জনপ্রিয় সে তার ফেসভ্যালু তত বেশি। তার পেছনে টাকা খরচ করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞাপন দাতারা। কিন্তু রানু মণ্ডলের সেই শিক্ষা, অভিজ্ঞতা বা গ্রুমিং কিছুই ছিল না। যার কারণে আমিও অবশ্য তাকে দোষারোপ করতে রাজি না। আদতে তার পরিবেশ বা পরিজন কেউই অমন ছিল না যাতে নতুন জনপ্রিয় অবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে পারতেন তিনি। তার এটা বোঝার সক্ষমতা ছিল না যে দর্শক বা ভক্তরাই তাঁকে জনপ্রিয়তা দিয়েছিল যাদের প্রতি তাদের আন্তরিক হওয়া উচিৎ ছিল।


তৃতীয় ঘটনায় ইয়োহানিকে দেখতে শিশুসুলভ মনে হলেও আদতে সে মাস্টার্স করা শিক্ষিত এক তরুণী। এই গানের পূর্বেই তার ক্যারিয়ারে সংগীত সংক্রান্ত অর্জন ছিল। এমনকি তার স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র এক্সপোর্টের বিজনেসও রয়েছে। মোদ্দাকথা জনপ্রিয়তা তার কাছে বাড়তি চাপ বা অভিশাপ হিসেবে না এসে তার ক্যারিয়ারে নতুন পালকের মতো কাজ করেছে।


ইয়োহানি একটা দৃষ্টান্ত যে লটারি বাস্তব জীবনে লটারি পাওয়ার সুযোগ কিভাবে তৈরি করে রাখতে পারেন। এক্ষেত্রে “মানিকে মাগে হিতে” তার লটারি ছিল। কিন্তু সে প্রস্তুত ছিল। জনপ্রিয়তা পেয়ে ধরে রাখতে পারার কাতারে দেশের জনপ্রিয় ইউটিউবার “কিটো ভাই” এর কথা বলা যায় অথবা “ভাইসাব” এর কথা। যাদের জনপ্রিয়তা পরবর্তী কার্যকলাপে তাদের যথেষ্ট উপযুক্ত মনে হয়। এছাড়াও তাদের ব্যাকাপ ক্যারিয়ার আছে। জনপ্রিয়তা দুর্ঘটনাবসত জনরোষ না হলে ওই জনপ্রিয়তা ছাড়াই তাদের জীবন চালিয়ে নিতে পারবেন তারা।


আপনার আমার অনেকের সেই গায়কী বা অভিনয় প্রতিভা হয়তো নেই! আমরা কি তাহলে বাস্তব জীবনে লটারি জিততে পারবো না?


আসলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জেতার দরকারও হয় না। কারণ লক্ষ্য করলে দেখবেন কতজন মানুষ জনপ্রিয়? বেশীরভাগ মানুষই সাধারণ। অনেকক্ষেত্রেই জনপ্রিয়দের থেকেও তারাই ভালো থাকেন, সুখে থাকেন।


তারপরও আপনার সুযোগ আছে এমনি এমনি ভাইরাল হয়ে যাওয়ার বা এখনকার ফেসভ্যালুর যুগের লটারি লেগে যাওয়ার। এর বাইরেও সম্ভাবনা বাড়াতে চাইলে আপনি বিনিয়োগ করতে পারেন। এখন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করবেন না ব্যাবসায় বিনিয়োগ করবেন সেটা আমি বলে দিচ্ছি না।


আদতে আঙ্গুল দিয়ে উপযুক্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্র দেখিয়ে দেয়ার মতো ফাইন্যান্স এক্সপারটিজও আমার নেই। বা হলেও আমার কথাই শুনতে হবে তাও জরুরি না।


এক্ষেত্রে আরো কম ঝুঁকির ক্ষেত্র হতে পারে মিউচুয়াল ফান্ডের মতো ক্ষেত্রে সঞ্চয়, এক্ষেত্রে অবশ্যই বিশ্বস্ত ব্যাংকে জেনেবুঝে কাজটি করতে হবে। অনেক টাকা একসাথে থাকলে নির্ভেজাল জমি একটা ভালো ক্ষেত্র। আপনার জমি থাকলে সেখানে আপনি কৃষি বাণিজ্য করতে পারেন। গাছ লাগিয়ে রাখতে পারেন।


বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে একটি সহজ হিসাব হচ্ছে অল্প বয়সে শুরু করে দেয়া। যেমন আপনি বিশ বছর বয়সে প্রতিমাসে দুই হাজার টাকা সঞ্চয় করলেন ( একরকম বলতে গেলে প্রতিমাসে দুই হাজার টাকার লটারির টিকেট কেনেন, যেই টিকিটে প্রায় নিশ্চিত আপনি একটা পুরস্কার পাবেন), আমি ত্রিশ বছর বয়সে প্রতিমাসে দুই হাজার টাকা সঞ্চয় করতে থাকলাম। আমারা উভয়েই পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত বাঁচলেও একই বয়সে আপনার প্রাপ্ত নিশ্চিত পুরস্কার গিয়ে দাঁড়াবে অন্তত ৭ লক্ষ বিশ হাজার টাকায়, আমার হবে ৪ লক্ষ আশি হাজার টাকা। অন্তত বললাম কারণ হিসেবটায় কোনরকম ইন্টারেস্ট নেই (টাকাপয়সা সংক্রান্ত ইন্টারেস্ট)। প্রফিট ও ইন্টারেস্টের অনেক ক্ষেত্র আছে, যেগুলোর কোনটি আধুনিক সমাজে আইনত বৈধ হলেও ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত। এই লেখায় জটিল সেই বিষয়গুলোতে আর আলোকপাত করলাম না।


ইন্টারেস্ট বা প্রফিটেবল কোন জায়গায় না রেখে টাকার নোট জমাতে থাকলে অবশ্য টাকার মুল্যমান কমবে ইনফ্লেশনের কারণে। ইন্টারেস্ট বা গ্রাম্য ভাষায় সুদ নেয়ায় অনাগ্রহীদের জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র রয়েছে।


ইন্টারেস্ট, ইনভেস্টমেন্ট রিটার্ন, পয়সা বাচানো, ব্যাবসায়ীক স্কোপ, প্রতারণা থেকে বাচার সম্ভাব্য উপায় এসব বিষয়গুলো অবশ্য DAWN TALES এ ধীরে ধীরে তুলে ধরবো। অনলাইনে যাতে এমনি এমনি সময় নষ্ট না হয়, আপনাদের সময়ের ভ্যালু এড করতে এই ধরনের বিষয়ের উপর কন্টেন্ট পাবেন। আপনাদের সহযোগিতা পেলে অনুপ্রেরণা পাবো এমন ভ্যালু এডিং কন্টেন্ট তৈরি করতে। কমেন্টে চ্যানেল লিংক দেয়া থাকবে, সাবস্ক্রাইব করলে মিউচুয়াল বেনিফট হবে কথা দিলাম। শেয়ার করতে পারেন পছন্দ হলে। Hope you create scopes and win a lottery in real life!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

NPUC value of food: Affordable nutrient rich foods list (Part 01)

কোন  খাবারে এক টাকায় কতটুকু পুষ্টি উপাদান পাচ্ছেন সেটাকেই বলছি নিউট্রিয়েন্ট পার ইউনিট কস্ট বা Nutrient Per Unit Cost (NPUC value) উদ্দেশ্য ক...