বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন, ২০২২

টেপা রুটি, অভ্যাস-আসক্তি পরিবর্তনে দূরত্বের গুরুত্বঃ ০২

টেপা রুটি নাম শুনেছেন কখনো?

হাতে টিপে টিপে যে রুটি বানায়, সেটাই টেপা রুটি।

ছোটবেলায় একবার আত্মীয়ের নতুন বাসায় যেয়ে প্রথম খাওয়া হয়েছিল। সেটা উদ্ভুত পরিস্থিতির কারনে ছিল। নতুন বাসায় খুবেকটা তৈজসপত্র আনেননি সেই আত্মীয়। তাছাড়া কয়েকমাস থাকার প্ল্যান করে তিনি বাসা নেয়ায় বাসায় জিনিসপত্র রাখেননি সবধরনের। যেকারণে রুটি বানানোর বেলন-পিড়িও ছিল না। তাওয়াও ছিল না রুটি স্যাকার।

কিন্তু রুটি বেশ সহজে খাওয়া যায়। ঝুট ঝামেলা কম। তার উপর ছোট বেলার বায়না রুটিই খাবো!

"প্রয়োজন উদ্ভাবনের জননী"

ছোট পাত্রে আটা গুলে হাতে টিপে তৈরি করে ফেলা হলো রুটি! অবশ্যই গোল হয় নি। কিন্তু, অনেক কষ্টে বানানো সে রুটি খুব তৃপ্তি সহকারে খেয়েছিলাম আমরা।

টেপা রুটির ইতিহাস ঘাটলে হয়তো বহুকাল আগে চলে যেতে হবে। ওদিকে না যাই।

সাম্প্রতিক ঘটনায় ফিরি।

রাত জেগে থাকার পর যখন ক্ষুধা চাপে, ঘরে খাওয়ার মতো চাবি-চুবি (চর্বনযোগ্য খাবার) না থাকে তখন খুব অসহায় অসহায় লাগে মাঝে মাঝে। মাঝে মাঝেই অমন পরিস্থিতিতে পড়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা হয়।

একদিনের তালিকায় এই "টেপা রুটি" ছিল। এমন না যে বেলন পিড়ি ছিল না! সেগুলো নামিয়ে ধুয়ে ব্যাবহার করে আবার পরিষ্কার করে রাখা খুবই ঝামেলা জনক ঠাহর হচ্ছিল সেদিন। তাই টেপা রুটি।

যারা রুটি নিয়ে একদমই জানেন না তাদের জন্য বলছি, গরম পানিতে আটা গুলিয়ে যে রুটি হয় সেটা নরম হয় ও নরম থাকে। অন্যদিকে, ঠান্ডা পানি দিয়ে গোলানো রুটি শক্ত হয় একটু আর নামানোর সাথে সাথে না খেয়ে ঠান্ডা হতে দিলে রাবারের মতো হয়ে যায়।

কিন্তু, ঠান্ডা পানির রুটি মুচমুচে করা সহজ। ঠান্ডা পানির রুটিই করি সেদিন, পানি গরম করার ঝামেলা থেকেও বাচা যায় তাতে।

বানানোর পর কি দিয়ে খাবো?

রান্নাঘর, ফ্রিজ খুজে তেমন কিছুই পাই না। ফ্রিজের কোনায় ঘি-এর কৌটায় চোখ যায়।

ঘি দিয়ে রুটি! কেন নয়!

সাথে একটু চিনি নিয়ে গরম গরম রুটি দিয়ে সেই রাতে ক্ষুধা নিবারন করি।

ঘি দিয়ে রুটি! কেন নয়!

যাইহোক, সে রাতে যদি ঘরে কৌটায় বিস্কুট থাকতো তাহলে কি রুটি বানাতাম? খুব সম্ভবত না।

এখান থেকে তিনটি উপলব্ধি পাওয়া যায়।

এক.

কোন বস্তু (বৃহদার্থে ব্যাক্তি) অপ্রতিস্থাপনযোগ্য নয়, কথাটি অনেকাংশে সত্য। উপোরোক্ত ক্ষেত্রে কৌটায় নিয়মিত থাকা বিস্কুট যদি মনে মনে ভাবে যে, আমি না থাকলে তোমার কি হবে ক্ষুধার্ত মানব! ক্ষুধা মিটাবে কি করে। বহু উত্তরের একটি হচ্ছে টেপা রুটির সাথে ঘি-চিনি।

দুই.

সৃজনশীলতার সাথে অভাবের একটা যোগসূত্র আছে, বলাই যায়। প্রয়োজন উদ্ভাবনের জননী কথাটিই এক্ষেত্রে বেশ মানানসই।

তিন.

পদার্থ বিজ্ঞান বলে একই সাথে একই সময়ে একই স্থানে দুটি বস্ত থাকতে পারে না। পদার্থবিজ্ঞানে দৌড় কম থাকায় অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারনা ব্যাখা করবো। বিস্কুটের প্রসংগে আসি…

যতদিন বিস্কুট বা অন্য খাবার ছিল কৌটায় ততদিন কি আমি টেপা রুটির কথা ভাবতাম! হয়তোবা না।

একটা শুন্যস্থান তৈরি হয়েছিল কৌটায়। যেটার অভাব পূরণ করতে টেপা রুটির দ্বারস্থ হতে হয়েছিল।

একই জিনিস যদি আমাদের দিনের ২৪ ঘন্টা সময়ের দিকে তাকাই! ২৪ ঘন্টাই আমরা কিছু না কিছুতে ব্যাস্ত। একসময় আমরা অলস সময় কাটাতে অভ্যস্ত থাকলেও এখন অনেকেই (অন্তত একটা বয়স পর্যন্ত) সারাদিন ব্যস্ত থাকি কিছুতে। ব্যস্ততাটা যে কাগুজে কাজকর্ম, তা নয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা সোশ্যাল মিডিয়া বা গেমস বা ইন্টারনেট ব্রাউজিং।

এই আধুনিক ভার্চুয়াল জগতগুলোর বেশিরভাগের এক্সেস আপাতদৃষ্টিতে ফ্রি মনে হলেও এগুলোতে আপনি আমি আমাদের এটেনশনের বিনিময়ে এগুলোকে এক্সেস করি। আমাদের এটেনশন তথা এনগেজমেন্ট যত বেশি, সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোরও সেগুলো ব্যবহার করে লাভ করার সম্ভাবনা তত বেশি।

আমরা কিভাবে কোম্পানিগুলোর ফাদে পড়ে সময় ব্যয় করে ফেলি?

মানবশরীরের বিস্ময়কর কেমিক্যাল ডোপামিন নিঃসরণের কারনে। ডোপামিনকে রিওয়ার্ড হরমোনও বলা হয়। আমাদের সুখ পাওয়ার সাথে এই হরমোন নিঃসরণের যোগসূত্র আছে। সেটা শারীরিক চাহিদা থেকে লব্ধও হতে পারে, প্রতিযোগিতা জয়ের আনন্দেও হতে পারে।

কিন্তু, সাইকোলজির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত সোশ্যাল মিডিয়াগুলো আরো সহজে এই ভালোলাগা, পুরষ্কার প্রাপ্তির ঘটনা তৈরি করে ফেলে মনের মধ্যে।

যেমনঃ আমার ভিডিওতে লাভ রিয়েক্ট আসলো পরিচিতজনের কাছ থেকে, আমি খুশি। স্বল্প পরিচিত জনের লাভ রিয়েক্ট, আরো খুশি!

আমরা যতক্ষন ব্যাবহার করতে থাকবো, বিভিন্নভাবে এই কৃত্রিম সুখ দিয়ে আমাদের ভুলিয়ে রাখবে।

এখন আমরা এই ডোপামিনের নিঃসরণ ছাড়া কোন কিছুতে যুক্ত থাকতে পারি না। পড়াশোনাতে আমাদের বিনোদন দরকার হচ্ছে (বিরোধিতা করছি না), চাকরিতে বিনোদন দরকার হচ্ছে, রাজনীতিতে বিনোদন দরকার হচ্ছে, দক্ষিনের বহু আকাঙ্ক্ষার ফসল অতিসাম্প্রতিক পদ্মা সেতুতেও বিনোদন দরকার হচ্ছে!

আমরা যেন বিরতই থাকি না কখনো! ক্লাসে গেম খেলা, ক্লাস শেষে রুমে ফেরার পথে ফেসবুক ব্রাউজ করা, বাসে চড়ার সময় গান শোনা, খাওয়ার সময় গান শোনা! আমাদের যেভাবে কোম্পানি গুলো গ্রাস করতে চাচ্ছে আমরাও সেভাবে গ্রাস হয়ে যাচ্ছি।

এতো লম্বা বিবরনের কারণ, আমরা যেই সময়টা স্ক্রলিং করে অপচয় করি সেই সময়টার মধ্যে কিছুটা হলেও সময় এসব ডোপামিন বুস্ট থেকে দূরে থাকা উচিত। এর ফাঁকে, সময় চিপে বের করে সৃজনশীল কাজ বা অর্থবহ কাজে ব্যয় করা উচিত।

নিজের উপর এক্সপেরিমেন্ট করেছেন কখনো?

সচেতন ভাবে আমি করেছি।

একবার আধা কিলোমিটার রাস্তা ছোট একটা কাজ করার জন্যে বের হই। পকেটে যাতায়ত ভাড়া বাদেও টাকা ছিল। কিন্তু ফিচারফোন, স্মার্টফোন কিচ্ছু নিই নি।

সেই জায়গায় যাওয়ার পর যার কাছে কাজের জন্য গিয়েছিলাম উনাকে না পাওয়ায় দশ মিনিট এদিক সেদিক করে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু বিধি বাম!

কি যেন নেই? আমি কি করবো! আমার হাত তো খালি!

এতো অসহায় শেষ কবে মনে হয়েছিল নিজেকে মনে পড়ে না। দম আটকে আসছিল সাধারণ মোবাইলফোন ছাড়া সময় কাটানোর কথা ভাবতে ভাবতেই!

এই সময়টাকে আবার ডাইভার্ট করে কাজেও লাগানো যায়। বিভিন্ন বক্তারা অনলাইন আসক্তি, ফোন টেপার অভ্যাস কাটাতে এমন অবস্থা তৈরির পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পুরনো অভ্যাসের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে অভ্যাস পরিবর্তন করার কথা বলেন তারা।

লক্ষ করবেন, আপনার কাছে যখন প্রথম অডিও মিউজিক সাপোর্টেড ডিভাইস এসেছিল তখন সেটাই এক্সাইটিং ছিল!

একইরকম ভাবে আপনার কাছে যদি এখন অডিও মিউজিক সাপোর্ট করা ফোন ছাড়া অন্য কোন ডিভাইস না থাকে তখন?

আপনি রগচটা না হলে খুব সম্ভবত এই ফোনেই থাকা গান বাজিয়ে শুনবেন। বাস্তবসম্মত করার জন্য ধরে নিন আপনি একটা নির্জন দ্বীপে গেছেন। সেখানে যাওয়ার পর আপনার স্মার্টফোন নষ্ট হয়ে যায়, নতুন স্মার্টফোন বা অমন ডিভাইস আনার সুযোগ নেই। অগত্যা আপনি আপনার ফিচার ফোনের সর্বাত্মক ব্যবহার করবেন। সেই ফোনের গানগুলোই আপনার নিত্যসঙ্গী হয়ে যাবে। হয়তোবা আপনি গান শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে নিজেই পছন্দের গান গলা ছেড়ে গেয়ে রেকর্ড করে আবার শুনবেন!

অতএব, মাঝে মাঝে ঘরের বিস্কুটের কৌটায় বিস্কুট না থাকা ভাল। তখন টেপা রুটির মতো জৌলুশহীন কিন্তু কার্যকর খাদ্যের দ্বারস্থ হবো আমরা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

NPUC value of food: Affordable nutrient rich foods list (Part 01)

কোন  খাবারে এক টাকায় কতটুকু পুষ্টি উপাদান পাচ্ছেন সেটাকেই বলছি নিউট্রিয়েন্ট পার ইউনিট কস্ট বা Nutrient Per Unit Cost (NPUC value) উদ্দেশ্য ক...