সোমবার, ১৬ মে, ২০২২

সার্কুলার ইকোনমির অ, আ, ক, খ ও কিপ্টার গল্প

সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা টেকসই উন্নয়নের সাথে আমরা অল্প বিস্তর সবাই পরিচিত। উন্নয়ন করা যতটা কঠিন, ধরে রাখা তার চেয়ে কঠিন।

প্রচলিত "স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা কঠিন" কথাটি এক্ষেত্রে যথার্থ। ধরুন কোন এলাকায় অনেক পরিমাণে কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে যারা কাজ পাচ্ছে না।

সেখানে একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করা হলো সরকারি/বেসরকারি উদ্যোগে। স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিতে প্রানসঞ্চার হবে ওই এলাকায়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে। গার্মেন্টস কেন্দ্র করে আরো অনেক ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, একটা ক্ষুদ্রাকায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারি, খাবারের দোকান, পরিবহন ব্যবস্থা, কাচামাল সরবরাহকারী সহ বৈচিত্র্যময় পেশার আবির্ভাব হবে।

একমুখী কথা বলে গেলাম। মুদ্রার আরেকটি পিঠ আছে। সেই গার্মেন্টস শিল্প যদি পরিকল্পিত না হয়? সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকে? উৎপন্ন বিষাক্ত বর্জ্য যদি উন্মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেয়া হয়! আপাতদৃষ্টিতে প্রথম কয়েক বছর টের পাওয়া না গেলেও ধীরে ধীরে এর প্রকোপ প্রকট হবে।

তুরাগতীরের ট্যানারি শিল্প ছিল এর অন্যতম একটা দৃষ্টান্ত। ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য কিভাবে একটি নদী ও আশেপাশের পরিবেশ, ইকোলজিতে প্রভাব ফেলতে পারে তা দেখেছি আমরা।

নদীর উপর অনেকের জীবিকা নির্ভর করে। তাছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য, ক্ষেত্রবিশেষ পরিবহন, বিনোদন অনেক কিছুই জড়িয়ে থাকে এর সাথে।

তার মানে শুধু উপার্জনের ক্ষেত্র তৈরির দিক চিন্তা করে পার পাওয়া যাবে না। পরিকল্পিত ক্ষেত্র হতে হবে।

আধুনিক গার্মেন্টসগুলো এক্ষেত্রে অনেকটাই সচেতন। রানা প্লাজা ধ্বস, তাজরীন ফ্যাশনে আগুন ইত্যাদির মতো ঘটনায় শ্রমিক নিরাপত্তাও অনেক বড় ইস্যু এখন। পাশাপাশি সচেতন বিদেশি ক্রেতারা এখন প্রোডাক্ট উৎপাদনে গ্রীন ইকোসিস্টেম, পরিবেশ বান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা ইত্যাদি খেয়াল করেন।

আগে "ভার্জিন ম্যাটারিয়েল" ট্যাগের পণ্যগুলো চাহিদায় উপরের দিকে থাকলেও এখন "রিসাইকেল্ড" ট্যাগলাইন অনেকটাই সচেতন হচ্ছে।

এখন আসি সার্কুলার ইকোনমি কি সে প্রসংগে।

সহজ চিত্রে সার্কুলার ইকোনোমি
সহজ চিত্রে সার্কুলার ইকোনোমি

আমরা সাধারণভাবে যে ব্যবস্থার সাথে পরিচিত সেখানে একটা কাচামালের রুপ পরিবর্তন করে উপযোগিতা বাড়ানো হয়। যেমন বনের কাঠ কেটে আসবাব পত্র বানিয়ে কয়েক বছর ব্যাবহার করে সেটা ভাগারে ফেলে দেয়া হয় বা পুড়িয়ে ফেলা হয়। একটা স্মার্টফোনে হরেক যায়গার উপাদান ব্যবহার করে তার জীবনকাল শেষ হলে ফেলে দিই ভেংগে বা ফেলে রাখি। যেটা একটা একমুখী ইকনোমিক ব্যবস্থা।

কিন্তু প্রকৃতির দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় প্রকৃতিতে প্রায় সবকিছুই (প্রায় বলে গা বাচালাম, তা নাহলে পদার্থ বিজ্ঞান পড়ে আসা ভাইয়েরা এন্ট্রপির উদাহরণ টেনে আনবেন) একটা চক্র মেনে চলে।

সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হচ্ছে পানিচক্র। নদী-নালার পানি শুকিয়ে বাষ্পীভূত হয়ে আকাশে মেঘ জমে, মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়, আবার নদীনালায় পানি হয়।

সার্কুলার ইকোনমি ব্যবস্থায় পন্যের জীবনচক্রকেও অমনভাবেই ডিজাইন করা হয়। যাতে কাচামাল হতে পন্য উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রাহকের কাছে ব্যবহৃত হয়ে আবার সবগুলো উপাদান ব্যবহারযোগ্য নতুন কাচামাল, ব্যাবহারযোগ্য পন্য বা পরিবেশ বান্ধব কোন রুপ দেয়া যায়। আদর্শ গ্যাসের মতো শতভাগ সার্কুলার লাইফসাইকেলের পন্য বাস্তবে সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু চেষ্টা করা হয় পন্য থেকে নিংড়ে সবটুকু উপযোগ নিয়ে নেয়ার।

যেমনঃ একটা ফোনকে পন্য হিসেবে না বেচে সার্ভিস হিসেবে বিক্রি করা। কিভাবে? বাস্তবে ভিত্তি আছে?

হ্যাঁ, আছে। রেন্ট-এ-কার বা বাইসাইকেল ভাড়ার ব্যাপারটা বলা যেতে পারে। আপনি একটা সময়ের জন্য পণ্যের (উক্ত ক্ষেত্রে ফোনের) সেবা ভাড়ায় নিলেন!

ইতোমধ্যে খেয়াল করেছেন নিশ্চয়িই, বিভিন্ন কোম্পানি পুরনো ইলেকট্রনিকস পন্য অদলবদলের সুবিধা রাখে। বা পুরোনো পন্য দিলে একটা ছাড় দেয় নতুন পন্যে! এটা সার্কুলার ইকোনোমির দিকে অগ্রসর হওয়ার একটা ধাপ।

পণ্য এক্সচেঞ্জ সুবিধা দেয় অনেক ব্র্যান্ড
পণ্য এক্সচেঞ্জ সুবিধা দেয় অনেক ব্র্যান্ড

(কোম্পানির নাম ভুলে গেছি) একটা মডিউলার হেডফোন কোম্পানি তাদের হেডফোন গুলো পার্টস আকারে ক্রেতার কাছে পাঠায় যেগুলো সংযোজন করে নিতে হয়। কোন একটা পার্টস নষ্ট হলে সেটা পাল্টাতে পারেন ক্রেতারা। একরকম হেডফোন রেন্টাল বলা যায়। যাতে নতুন নতুন মডেল আসলে পরিবর্তন করতে হয় বিশেষ বিশেষ অংশ। এর ব্যাবসায়ীক সুবিধা হিসেবে উদ্যোক্তারা বলেন, এতে তাদের প্রিমিয়াম সেগমেন্টের (সবচেয়ে দামী) হেডফোন গুলোও সাধারনেরা নিতে পারছেন। কারন একবারে দাম দিয়ে নিতে হয় না। ধরুন এক হাজার দুইশত টাকা দাম হলে প্রতি মাসে এক শত করে দিলেই হচ্ছে! আবার এরই মধ্যে অন্য মডেল পছন্দ হলে সেটাও নেয়ার সুযোগ থাকে। তারা ফেরত নেয়া পণ্যগুলো রিসাইকেল, রিফারবিশ করে পুনরায় বাজারজাত করেন।

সম্প্রতি ইউ এস এ-তে আইফোনের বিরুদ্ধে "রাইট টু রিপেয়ার" আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়। আন্দোলনকারীদের দাবী ছিল আইফোনগুলো নষ্ট হলে মেরামতের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে অথবা তাদের (এপলের) বিজনেস মডেলের ফাদে নতুন ফোন কেনায় বাধ্য করা হচ্ছে কাস্টমারদের। অবশ্য আইনের খরগ পরার আগেই এপল আইফোন সেল্ফ রিপেয়ার কিট লঞ্চ করেছে (যেটা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে)।

ইলেকট্রনিকস পন্যগুলোতে অনেক রেয়ার আর্থ মেটাল (মূল্যবান ও দূর্লভ খনিজ ধাতু) ব্যবহৃত হয়। এটা শুনে অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে একসময় সেই খনিজগুলোর উত্তোলন ও সরবরাহ শূন্যে নেমে আসবে। তখন?

এর জন্য প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের রিসাইকেলিং করতে হবে। তাতে বেশ কয়েকটি চাক্ষুষ উপকার আছে। খনিজের উপর নির্ভরতা কমানো, বর্জ্য পদার্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা, দূরদর্শী অর্থনৈতিক চিন্তার সুফল তো থাকবেই!

বাংলাদেশে বিক্রয় ডট কম, সোয়াপ ডটকম 

পণ্য অদল বদল করা যায় এই ই-কমার্স প্লাটফর্মে
পণ্য অদল বদল করা যায় এই ই-কমার্স প্লাটফর্মে

বা ফেসবুকে মিলিয়ন সদস্যের গ্রুপ "রিসাইকেল বিন" পুরনো পন্য কেনাবেচা/আদানপ্রদানের সুযোগ করে দিয়ে বিদ্যমান সম্পদের অধিক উপযোগিতা বের করে আনায় অবদান রাখছে।
ফেসবুক গ্রুপ রিসাইকেল বিন
ফেসবুক গ্রুপ রিসাইকেল বিন

"এলেন ম্যাকার্থার ফাউন্ডেশন" ওয়েবসাইটে ও ইউটিউব চ্যানেলে সার্কুলার ইকোনমি নিয়ে আরো অনেক তথ্য পাবেন।
Ellen MacArthur
Ellen MacArthur


কিপ্টার গল্প শুনেছিলেন কখনো?

এক কিপটা দুইশত টাকায় পাঞ্জাবি কিনে পাঁচ বছর পরার পর সেটা কেটে ফতুয়া বানিয়ে আরো দুই বছর পরে। তারপর সেটাও নষ্ট হতে শুরু করলে সেন্ডো গ্যাঞ্জি বানায় ফতোয়া দিয়ে। আরো এক বছর পরার পর সেটা কেটে রুমাল বানায়। রুমাল ছয় মাস ব্যবহার করে যখন আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না রুমাল পুড়ে ছাই দিয়ে দাঁত মাজে পুকুরপাড়ের ঘাটে। দাঁত মাজার সময় বলে, "হায়রে আমার দুইশো টাকাই জলে গেলো!"

গল্পের ওই কিপটা বেচে থাকলে আজকে সার্কুলার ইকোনমির রোল মডেল হতেন নিঃসন্দেহে! শুনতে হাস্যকর মনে হলেও কিপ্টার কাজই ছিল পরিবেশের জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতিকর।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

NPUC value of food: Affordable nutrient rich foods list (Part 01)

কোন  খাবারে এক টাকায় কতটুকু পুষ্টি উপাদান পাচ্ছেন সেটাকেই বলছি নিউট্রিয়েন্ট পার ইউনিট কস্ট বা Nutrient Per Unit Cost (NPUC value) উদ্দেশ্য ক...