বৃহস্পতিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২২

আমরা কেন আপরাধ করে নিজের সাফাই গাই? - অপরাধ মনঃস্তত্ত্ব

 আমরা কেন আপরাধ করে নিজের সাফাই গাই? - অপরাধ মনঃস্তত্ত্ব


“আমরা মানুষেরা অদ্ভুত মেন্টালিটির! না মানে চিন্তা করুন, একসাথে বিয়ে ছাড়া থাকা যাদের কাছে অবৈধ বা নীতিবিরোধী মনে হয়েছে তাদেরও কেও কেও ছিনতাই, মাদক, খুনের মতো গর্হিত অপরাধে যুক্ত হচ্ছি।”


আমিই বলেছিলাম। কথাগুলোর বিপরীতে কিছু ব্যাখ্যা পেয়েছি। বিয়ের ব্যাপারটার চেয়ে আয়ের ব্যাপারটার পার্থক্য খুব সম্ভবত পেটের দায়ে।


তাছাড়া আমরা সবাই কোন না কোন দিকে ছাড় দিই। আমাদের কৈফিয়ত থাকে। কৈফিয়তগুলো বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যৌক্তিকও।


পদার্থবিজ্ঞানের পুরনো সুত্র (একই সময়ে একই স্থানে দুটি বস্তু থাকতে পারে না অথবা একই সময়ে দুটি স্থানে একই বস্তু থাকতে পারে না) ছাড়াও লজিক্যলি ভাবলেই বুঝতে পারি। বর্তমান বিশ্বের বিস্তৃত জ্ঞানের পরিধি যেমন কারোর একার পক্ষে আয়ত্ত্ব করা সম্ভব নয়, তেমনি বিচিত্র ও ব্যাপক পেশার জগতে কেও একাই সব হতে পারবে না।


উদাহরণ দিয়ে বলি। একজন গ্রাম্য চোরের সরদারের কথা ধরুন যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, দেরী করে নামাজ পড়লে তার কেমন কেমন লাগে দাবী করেন! অথবা ধরুন একজন পুণ্য প্রার্থীর কথা যে তার অসুস্থ গর্ভধারিণী মাকে দেখতেও যায় না কিন্তু গঙ্গায় ডুব দেয়ার জন্য একশো মাইল পাড়ি দেয়!


তাদের মনে আসলে কি চলে? ধর্ম কর্ম দেখিয়ে আশেপাশের মানুষকে ভুলিয়ে রাখা! নাকি আছেন আমার মোক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার। শেষ বিচারে তিনিই আমায় করবেন পার।


আমি তো তার আরাধনা করতেছি। মুসলমান হলে ভাবতেছি নামাজ কালাম করি, আল্লাহ্‌ ক্ষমা করবে না আমায়? হিন্দু হলে ভাবি হয়তো


“করেছি পাপ,

তাতে কি?

দিবো ডুব, সব হইবে সাফ!”


মোদ্দাকথা আমদের করা ভুলগুলোর একটা যাস্টিফিকেশন আমরা করে ফেলি। আমাদের নিজেদের কৃতকাজের একটা আলাদা বৈধতা খুঁজে বের করে ফেলি।


এমন পরিস্থিতিতে খুবই দোলাচালে পড়ে যাই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে।


“দুর্জন বিদ্যান হইলেও পরিত্যাজ্য”


আবার


“মূর্খ বন্ধুর চেয়ে শিক্ষিত শত্রু ভালো”


এর চিপায় পড়ে যাই হরহামেশাই! টাকাকে বিবেচনায় এগিয়ে রাখা বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার কি আমার আদর্শ?


আমি পড়ালেখায় ভালো না হলেও কখনো নেশার কাবু হই নি কিন্তু আমার অত প্রাণীপ্রেম নাই, কুকুর বিড়াল দেখলে কোলে তোলা বা বিস্কুট কিনে দেয়া আমাকে দিয়ে হয় না। আবার আমার বন্ধু নেশায় বুঁদ থাকে, ভালো রেজাল্ট করছে পাশাপাশি আশেপাশে কুকুর বেড়াল থাকলে কিভাবে যেন তার কাছে আসে, কোলে চড়ে বসে। সেও সিগারেটের টাকায় তাদের বনরুটি কিনে দেয়। তাহলে কে ভাল? আমি না আমার বন্ধু?


অবশ্য এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ করতে আমার আরেক বন্ধুর ইমোশনাল ইন্টিলিজেন্সের উদাহরণ দেয়া যায়। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন বিপদে পড়লে প্রথম কোন বন্ধুর কথা মনে পড়বে? কি ভাবছেন! আমার নাম বলেছে, আমি খুশি হয়েছি শুনে? উত্তর তার চেয়ে ভাল ছিল। সে বলেছে, কোন বন্ধুকে মনে করবো বা কাকে বলবো এটা নির্ভর করবে সমস্যার ধরন আর কোন জায়গায় ঘটেছে তার উপর।


সহজ করে বললে পড়াশোনা নিয়ে সমস্যায় পড়লে ক্লাসের রেগুলার পড়া কমপ্লিট করা বন্ধুর কাছে, অসুখ হলে ডাক্তার বন্ধুর কাছে ইত্যাদি। ডাক্তার প্রসঙ্গে মনে পড়লো। আপনার স্ত্রীর অসুখ হলে যদি দুটো অপশন থাকে আপনার কাছে, দুজনই সমান দক্ষ।


আপনি স্ত্রীকে চারিত্রিক স্খলন আছে এমন ডাক্তারের কাছে নিবেন নাকি বেনামাজি ডাক্তারের কাছে নিবেন? এখানে প্রফেশনালিজমের প্রশ্ন চলে আসে। ডাক্তারের রুগির সাথে প্রফেশনাল আচরণ বলতে রোগীকে হয়রানি না করাটা মুখ্য, এক্ষেত্রে ডাক্তার কতটা ধার্মিক এই ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই প্রফেশনালিজমের মুখ্য বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে না।


এবার জটিলতায় না গিয়ে সহজ উদাহরণে আসি। মেম্বার সাহেবের পরিবারের মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে দুটি অপশন থাকলো ঘুষখোর পুলিশ অফিসার অন্যদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক!


বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, সেই পুলিশ অফিসারের অন্য অনেক গুন খুঁজে বের করবো আমরা। অথবা তার বাবা দেশের জন্য কি করে গিয়েছিল সেটা বের করে সান্ত্বনা দিবো। যে আমাদের মেয়ে (মেম্বার সাহেবের মেয়ে) বন্ধুদের সাথে দুয়েকবার নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ধরা খেলেও তো অন্যান্য দিক খুবই ভালো ও সংসারী। সে নিশ্চয়ই তার ঘুষখোর বরকে বিয়ের পর সুপথে নিয়ে আসবে!


এখন প্রথম উদাহরণে ফিরি, “আমরা মানুষেরা অদ্ভুত মেন্টালিটির! না মানে চিন্তা করুন, একসাথে বিয়ে ছাড়া থাকা যাদের কাছে অবৈধ বা নীতিবিরোধী মনে হয়েছে তাদেরও কেও কেও ছিনতাই, মাদক, খুনের মতো গর্হিত অপরাধে যুক্ত হচ্ছি।”


গর্হিত অপরাধ করছি কারণ পেটের দায়। অর্থাভাব। অর্থকষ্ট। অর্থ যোগাড় করে ফিন্যানশিয়াল স্ট্যাবিলিটি অর্জন। এর মাধ্যমে অপরাধীদের জন্য জাস্টিফিকেশনের উপায় বের করছি না। তবে এইসব ব্যাপারগুলো চিন্তা করেই খুব সম্ভবত মারাত্নক অপরাধীদের (ছিনতাই করতে খুন করা) আমাদের দাবী করা ফাঁসির বদলে কারাদণ্ডের মতো লঘুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। হ্যাঁ, হয়তো ফাঁকফোকর আছে সিস্টেমের। তবে কারণ খুব সম্ভবত পেটের দায় এর মতো মৌলিক চাহিদাই।


শিরোনামের সম্প্রসারণের সমাপ্তি এখানেই। এবার প্রচলিত অপরাধ প্রতিরোধ, অনুঘটক নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।


অর্থের সংস্থানের পথ সহজ হলে যে ছিনতাই এর মত অন্যের অর্থের উপর অনধিকার চর্চা সংক্রান্ত অপরাধ কমে আসে তা, “ময়মনসিংহের মাদকাসক্তি, ছিনতাই, অটোচালনা ও অপরচুনিটি কস্ট” লেখায় বলেছি।


সহজে উপার্জন করতে পারার একটা খারাপ দিক যে নেই এমন না। উদাহরণ হিসেবে বাকৃবি ক্যাম্পাস সংলগ্ন চাষি ভবনের পেছনের ছোট্ট যে মহল্লা, সেটার একটা পার্সোনাল অবজারভেশন তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ্‌। তবে সামনের কোন লেখায়।


মানুষের জীবন চলতে মৌলিক কিছু চাহিদা পূরন করতে হয়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ছোটবেলায় পড়ে আসা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত মৌলিক চাহিদা। এরপরে যুক্ত হয়েছে সুশিলজনেরা যোগ করেছেন বিনোদন, যেটা ব্যাক্তি-সামাজিক-রাষ্ট্রীয় কোন পর্যায় থেকেই কমতি রাখা হয় না ইদানীং।


চাহিদার ক্ষেত্রে মৌলিক চাহিদাগুলো মোটামুটি প্রাকৃতিক হলেও কিছু চাহিদা কৃত্রিম। যেগুলো তৈরি হয় সামাজিক, নৈতিক দায়বদ্ধতার অভাবে অথবা মানসিক দৃড়তার অভাবে। যার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ মাদক।


মানবশিশু জন্মের পর থেকে তার খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা প্রভৃতি ধাপে ধাপে প্রয়োজন পড়লেও মাদক কখনোই বাধ্যতামূলক প্রাকৃতিক চাহিদা নয়। মানবমনে এর চাহিদা তৈরি হয় কৃত্রিম সংকটে। কিভাবে এমন কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হয়? এর চাহিদায় লাভ কাদের? এটাও ইনশাআল্লাহ্‌ মোটা দাগে বলবো পরবর্তী কোন লেখায়।

সারমর্মঃ

-অনেক অপরাধীর অপরাধের মূল কারণ পেটের দায়

-সহজে উপার্জনের পন্থা পেলে ছিনতাই এর মতো কাজ ছেড়ে দেয়ার নজির আছে

-নিজের দোষকে (অপরাধ) লঘু প্রমাণে সিদ্ধহস্ত আমরা

-মুখে নৈতিক দায়বদ্ধতার কথা বললেও মোটা দাগে টাকার কাছে সবাই (প্রায়) নত

-অপরাধের রসদ যোগানো কার্যকলাপ জেনে বুঝেই বন্ধ করা হয় না, অনেকের স্বার্থ জড়িত

(অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞান পড়ুয়া এবং বোদ্ধারা গালিগালাজ করতে চাইলে সাক্ষাতে অথবা কমেন্টে আমন্ত্রিত)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

NPUC value of food: Affordable nutrient rich foods list (Part 01)

কোন  খাবারে এক টাকায় কতটুকু পুষ্টি উপাদান পাচ্ছেন সেটাকেই বলছি নিউট্রিয়েন্ট পার ইউনিট কস্ট বা Nutrient Per Unit Cost (NPUC value) উদ্দেশ্য ক...