ময়মনসিংহের বড় মসজিদ গেটের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেই হঠাৎ চোখ পরলো ইঞ্জিন চালিত মেশিনে আখের রস তৈরী করছেন এক অর্ধ বয়স্ক মুরব্বি লোক। ওনাকে দেখে মনে মনে একটি লাইন উচ্চারিত হলো-
বয়সের ধার ধারে না জীবন, বেঁচে থাকার তাগিদেই জীবন বেছে নেয় যেকোনো জীবিকা।
খুব একটা ব্যস্ততা না থাকায় মনের কৌতূহল বশত এগিয়ে গেলাম অর্ধবয়স্ক লোকটির সামনে।
ছোট্ট এই ইঞ্জিন চালিত মেশিনে চার-পাঁচটি গ্লাস, একটি জগ, একটি পানি ভর্তি বালতি আর অনেকগুলো আখ ( কুইশর) নিয়ে মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন এই লোকটি।
হুট করে কথা বলা যায় না বিধায় এক গ্লাস আখের রস দিতে বললাম মুরব্বি কে। দুটো আখ চাপকলে ঢুকিয়ে দিলেন, মেশিনের চাপে আখের রস নিংড়ে পরছে।
গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মুরব্বিকে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম, উত্তরে তিনি বললেন দুলাল মিঞা। লোকটির ব্যবহার ভালো।
কিছুটা বন্ধুত্ব পারায়ণ হয়ে মুরব্বির কাছে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম ;
উত্তরে তিনি বলেন- গ্রামের বাড়ি, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া। পরিবার ফুলবাড়িয়া থাকলেও তিনি ব্যবসার কারণে এখানেই থাকেন, কেওয়াট খালি রেল ব্রীজের নিচে।
দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে বিবাহিত, পেশায় ইঞ্জিন মেকানিক। ছোট মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে।
এই পেশায় কেমন করে এসেছেন জানতে চাইলে দুলাল মিঞা বলেন - ১৯৯৩ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করেছিলেন তিনি। এর পর জীবিকার তাগিদে চলে যান ঢাকা শহরে। সেখানে আট বছর এই আখের রসের ব্যবসা করে ময়মনসিংহ চলে আসেন।
১২ বছর যাবত বড় মসজিদের সামনে আখের রস বিক্রি করছেন। সকাল ১০ টায় ভ্যান নিয়ে চলে আসেন এখানে, ব্যবসার পাট চুকিয়ে রাত ১১ টায় চলে যান।
ব্যবসার প্রথম দিকে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ডিজেল চালিত আখের রস বের করার জন্য পুরাতন একটি মেশিন কিনেছিলেন। সে মেশিনটি ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। পরবর্তী তে ৭২ হাজার টাকা খরচে ভ্যান সহ ব্যাটারি চালিত একটি মেশিন কিনেন।
কোন জায়গা থেকে আখ সংগ্রহ করেন তা জানতে চাইলে দুলাল মিঞা বলেন-
ফুলবাড়িয়ার বিভিন্ন আখ চাষীদের কাছ থেকে মৌসুমে মৌসুমে সরাসরি আখের ক্ষেত কিনে নেন। সেখান থেকে আখ কেটে পাঠানোর ব্যবস্থা আছে। সংগ্রহকৃত আখ নিজেই চেঁছে-ছিলে প্রস্তুত করেন।
প্রতিদিন কেমন বিক্রি হয় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-
শীতের তিনমাস পৌষ-মাঘ-ফাল্গুন বিক্রি কম হয়। দিনে ১২০০-১৫০০ টাকা। খরচ বাদে ৫০০ টাকার মতো থাকে।
বাকি নয়মাস গরমের সময় দিনে প্রায় ৩-৪ হাজার টাকা বিক্রি হয়। যেখানে বিক্রির প্রায় অর্ধেক লাভ থাকে সাধারণত। এভাবেই দুলাল মিঞা ২০ বছর যাবত চালাচ্ছে জীবন-জীবিকা এবং একটি সংসার।
গ্লাসে আখের রস অনেক আগেই শেষ, মুরব্বি কে জিজ্ঞেস করলাম চাচা এক গ্লাস কত?
মুচকি হেসে তিনি উত্তর দিলেন - বাবা প্রতি গ্লাস ১০ টাকা...
লেখাঃ শোভন
সাক্ষাৎকারঃ বদরুল
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন